দৈনিক আজিজ:
'বিশ্ব সংবাদ পড়ছি 'রমেশ পাইন'
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির আদেশ
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরে নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল আজ মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। একাত্তরে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধে মামলায় তার বিরুদ্ধে আনা ২৩ টি অভিযোগের মধ্যে হত্যা, গণহত্যাসহ নয়টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, আটটি অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। এছাড়া ছয়টি অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেছেন, অভিযোগ সংগঠিত হওয়ার সময়ে তিনি পাকিস্তানে ছিলেন; দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের দেয়া এমন সাক্ষ্য আমলে নেয়নি ট্রাইব্যুনাল।
রায় ঘোষণার পর এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, নতুন চন্দ্রসিংহ হত্যাকাণ্ডসহ অভিযোগ চারটিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। তিনটি অভিযোগে ২০ বছর করে কারাদণ্ড, দুইটি অভিযোগে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হিন্দুদের উপর নির্যাতন ও গণহত্যার দায়ে তার এ শাস্তি ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল।
যে নয়টি অভিযোগে সালাহউদ্দিন কাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে সেগুলো হলো- ২ নম্বর অভিযোগ মধ্য গহিরায় গণহত্যা, ৩ নম্বর অভিযোগ নূতন চন্দ্র হিংস হত্যা, ৪ নম্বর অভিযোগ জগত্মলল পাড়া গণহত্যা, ৫ নম্বর অভিযোগ সুলতানপুরে নেপাল চন্দ্র ও অপর তিনজনকে হত্যা, ৬ নম্বর অভিযোগ ৬৯ পাড়া গণহত্যা, ৭ নম্বর অভিযোগ সতিশ চন্দ্র পালিত হত্যা, ৮ নম্বর, ১৭ নম্বর অভিযোগ নিজাম উদ্দিন আহম্মদকে অপহরণ ও নির্যাতন এবং ১৮ নম্বর অভিযোগ সালেহউদ্দিন আহমদকে অপহরণ ও নির্যাতন।
যে আটটি অভিযোগ থেকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে খালাস দেয়া হয়েছে সেগুলো হলো- ১ নম্বর অভিযোগ গুডস হিলে সাতজনকে অপহরণ ও নির্যাতন করে, ১০ নম্বর অভিযোগ মানিক ধরের বাড়ি লুট, ১১ নম্বর অভিযোগ বোয়াল খালী গণহত্যা, অভিযোগ মোজাফফর ও তার ছেলে শেখ আলমগীর হত্যা, ১২ নম্বর অভিযোগ বিজয়কৃষ্ণ ও দুইজনকে হত্যা, ১৪ নম্বর অভিযোগ হানিফ হত্যা, ১৯ নম্বর অভিযোগ মাহবুব আলম হত্যা, ২০ নম্বর অভিযোগ এখলাস হত্যা এবং ২৩ নম্বর অভিযোগ সলিমুল্লাহর উপর নির্যাতন। যে ছয়টি অভিযোগের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করেননি সেগুলো হলো- ৯, ১৩, ১৫, ১৬, ২১ এবং ২২।
রায় ঘোষণা উপলক্ষে সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে বিএনপির এই নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে নেয়া হয়। এ সময় অন্যান্য দিনের চেয়ে তাকে বেশ বিমর্ষ দেখাচ্ছিল।
গত ১৪ আগস্ট মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া শেষে সালাহউদ্দিন কাদেরের রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষ একাত্তরে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্মান্তরে বাধ্য করাসহ ১৭ টি অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী হাজির করে। সাক্ষীদের দাবি কোন কোন ঘটনা তার উপস্থিতিতে এবং নির্দেশে সংঘটিত হয়েছে। অন্যদিকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে বলেছেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ওই সময়ে বাংলাদেশেই ছিলেন না। তিনি সে সময় লেখাপড়ার জন্য পাকিস্তানে ছিলেন। পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সহপাঠী সুপ্রিম কোর্টের বিচারক বিচারপতি শামীম হাসনাইনও প্রধান বিচারপতির কাছে লেখা এক চিঠিতে জানিয়েছিলেন, সালাহউদ্দিন কাদের ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে আগষ্ট মাস পর্যন্ত পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছিলেন। দুই পক্ষের এই পরস্পরবিরোধী দাবির মুখে আজ ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করল।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম গতকাল বলেন, এটি মিথ্যা মামলা। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ থেকে ১৯৭৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে ছিলেন না। এটা আমরা দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি। রাষ্ট্রপক্ষ জেরাকালে সালাহউদ্দিন কাদেরকে প্রশ্ন করেছিল, তিনি বেনামে ও বেআইনিভাবে ১৯৭৪ সালে দেশে এসেছিলেন। এ প্রশ্নের মাধ্যমে তারা স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ১৯৭১ সালে সালাহউদ্দিন কাদের দেশে ছিলেন না। এছাড়া তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করেছেন ১৯৭১ সালে সালাহউদ্দিন কাদের বাংলাদেশে ছিলেন এ মর্মে তার কাছে কোনো দলিলপত্র নেই।
ফখরুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী গোপাল জবানবন্দীতে বলেছেন, তিনি সালাহউদ্দিন কাদেরকে দেখেছিলেন। কিন্তু জেরার জবাবে তিনি বলেছেন, ১৩ এপ্রিল ১৯৭১ সাল থেকে ২৮ এপ্রিল ভারত যাওয়ার পথে ২৭ এপ্রিল তিনি একবার মাত্র কুন্ডেশ্বরীতে গিয়েছিলেন। অতএব ১৩ এপ্রিল কুন্ডেশ্বরীতে সালাহউদ্দিন কাদেরকে দেখা একটা মিথ্যা। সাক্ষী রাষ্ট্রপক্ষের শেখানো মতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ ধরনের সাক্ষীর উপর ভিত্তি করে কোনো সাজা হলে তা হবে ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তিনি বলেন, আইন পরিবর্তন করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সালাহউদ্দিন কাদেরকে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। আমরা আশা করি, এই মিথ্যা মামলা থেকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বেকসুর খালাস পাবেন।
২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিনে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ওই বছরের ১৪ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হলে ১৭ নভেম্বর তা আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন